শনিবার, ০৪ Jul ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ন
ফিলিপাইনের ফার্স্টলেডি ইমেলদা মার্কোসের তিন হাজার জোড়া জুতার কথা হয়তো এখনো অনেকের মনে আছে। সে জুতার খবর ছিল বিশ্বময় আলোচিত সংবাদ। এমনকি মার্কোসের ক্ষমতাচ্যুতির খবরও চাপা পড়েছিল ফার্স্টলেডির জুতার খবরে। আজ থেকে ৩৬ বছর আগে, সেটা ১৯৮৬ সালের কথা। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট তখনও নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোস। কঠোর হাতে দেশ চালান। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত তার সরকার ও পরিবারের লোকেরা। ফার্দিনান্দ মার্কোসের স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসের সংগ্রহে তিন হাজার জোড়া জুতা, ছয় হাজার দামি ব্র্যান্ডের পোশাক। অন্যান্য বিলাস সামগ্রীর অভাব নেই।
তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে বিলাসী জীবনযাপনের পরিবার। দেশের বিরোধী দলকে তিনি থোড়াই কেয়ার করতেন। মার্কোসের কাছে বড় ছিল তার পরিবার এবং বিলাসী জীবন। পুরো দুনিয়াতে যে ক’জন স্বৈরশাসকের নাম সামনের কাতারে, তাদের একজন মার্কোস। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি বিরোধীদের দমন করিয়েছেন কঠোর হাতে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে তার বিরোধী মতো প্রকাশকারীদের হত্যা করিয়েছেন। ফার্দিনান্দ মার্কোসে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ফিলিপাইনে বিকল্প আরো দুটি ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল- একটি তার স্ত্রী ইমেলদা মার্কোস, অন্যটি ২৮ বছরের ছেলে বংবং-কে ঘিরে। দুর্নীতির সব কমিশনের সমান ভাগ দিতে হতো ইমেলদা ও ছেলে বংবংকে।
বংবং পিতার পর নিজের ক্ষমতা স্থায়ী করতে রাজনৈতিক কর্মী ও প্রশাসনের ভেতরে একটি আলাদা বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। সে সময়ে ফিলিপাইনের জনগণ ভাবতে শুরু করে তাদের ভবিষ্যত যুবরাজ হচ্ছেন বংবং। সেভাবেই চলাফেরা করতেন তিনি। কিন্তু বিধিবাম! একটি ভুলে, একটি অপকর্মে টাইফুনের আঘাতে মাত্র দুই দিনে ধুলিসাৎ হয়ে গেলে মার্কোস পরিবারের ভবিষ্যত সব স্বপ্ন-সাধ। ক্ষমতা ছাড়তে হলো, ছাড়তে হলো দেশও। বিদ্রোহী জনতা মার্কোস পরিবারের প্রাসাদে ঢুকে বিশ্ববাসীকে দেখাল তাদের বিলাসী জীবনের নমুনা।
ফিলিপাইনে সে সময়ে বিরোধী নেতা ছিলেন বেনিগেনো একুইনো। তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন একুইনো। দীর্ঘ নির্বাসন জীবনের ইতি টেনে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ফিলিপাইনে ফিরবেন, নিজ দেশের জনগণের জন্য লড়াই করবেন। তবে তার লড়াই করা হয়নি, দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে বিমানের ভেতরেই তাকে গুলি করে হত্যা করে মার্কোসের প্রাইভেট বাহিনী। একুইনোকে বরণ করে নিতে বিমানবন্দরের বাইরে তখন হাজার হাজার জনতা। একুইনোকে হত্যা করার খবর বাইরে পৌঁছতেই শুরু হয় জনবিক্ষোভ। মাত্র দুই দিনের বিক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত হন মার্কোস। দেশও ছাড়তে হয় তাদের। মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত হলে ফিলিপাইনে নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে শতকরা ৯৩ ভাগ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন একুনোর স্ত্রী কুরাজান একুইনো। সফলতার সঙ্গে পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। এরপর ৩৬ বছর বিভিন্ন দল ও ব্যক্তি ফিলিপাইন পরিচালনা করেছেন। ৩৬ বছর পর এবারের নির্বাচনে ফিলিপাইনের ক্ষমতায় ফিরেছেন মার্কোসের ছেলে। এক সময় ফিলিপাইনের ৬৫ ভাগ অপরাধ ও শতভাগ রাজনৈতিক নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের হোতা বংবং, যার পুরো নাম ফার্দিনান্দ রোমুয়ান্ডেজ মার্কোস জুনিয়র।
এত বড় একজন স্বৈরশাসকের ছেলে, এত বড় অপরাধী-খুনী মাদক কারবারি বংবং কিভাবে দাপটের সঙ্গে শতকরা ৬৮ ভাগ ভোট পেয়ে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো? এর নেপথ্যে রয়েছে বংবং-এর এক বিশাল পরিকল্পনা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। বংবং প্রায় এক দশক ধরে ফিলিপাইনজুড়ে অর্থের বিনিময়ে কয়েক লাখ যুব সমাজের একটি গ্রুপ গড়ে তুলেছে। না সন্ত্রাসী হিসেবে নয়, বিশাল এই গ্রুপকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের কাজে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য যতগুলো মাধ্যম রয়েছে, সবগুলোতে বংবং মার্কোস জামানার গুণগান প্রচার করেছে এবং মার্কোস পরবর্তী শাসকদের যাবতীয় ভুল দ্রুটি তুলে ধরেছে।
ফিলিপাইনের প্রায় ৬০ ভাগ ভোটারের বয়েস ৪৫ বছরের মধ্যে এইসব ভোটাররা কেউ মার্কোসের স্বৈরশাসন সম্পর্কে অবগত নন, তাদের কাছে মার্কোস বা সে সময়ের বংবং অপরাধ সম্পর্কে সব কিছু অজানা। সেগুলো জানতে ইতিহাস ঘাটতে হয়, বর্তমান যুগে কেউ ইতিহাস ঘাটতে চায় না। তারা চোখের সামনে মার্কোস পরবর্তী যুগের শাসন দেখে দেখে বড় হয়েছে। অন্যদিকে, এক দশক ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে আসছে মার্কোস যুগে দেশের মানুষ ভালো ছিল, জীবন মান উন্নত ছিল, মার্কোস ছিল ভালো মানুষ, বংবং হচ্ছে সাচ্চা দেশপ্রেমিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মার্কোস পরিবারের ভালো কথা শুনতে শুনতে ফিলিপাইনের যুব সমাজের একটি বিশাল অংশ ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়ে বংবং এর দিকে। এছাড়া স্বৈরশাসক হলেও মার্কোস পরিবারের বিশেষ করে তাদের গ্রামের বাড়ি যে অঞ্চলে ওই দ্বীপের মানুষকে আঞ্চলিকতার জালে বেঁধে ফেলতে সক্ষম হন বংবং। অন্যদিকে, ফিলিপাইনে সবচেয়ে রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রুদ্রিগেজের দলের সঙ্গে আপস করে জোট বেঁধে তার কন্যাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জোটে নেন বংবং। এতে জয় আসে বংবং-এর ঘরে। অপরদিকে, বংবং-এর এই তথ্য প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারের বিপরীতে তার বিরোধীরা ছিল নীরব, তারা ক্ষমতা ভোগ ও নেতা বন্দনায় বেশি ব্যবস্থা ছিল। মার্কোসের সময়ে ফিলিপাইনের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের প্রশ্ন সামনে এলে তার ঘোরবিরোধী ছিলেন মার্কোস ও বংবং। সে সময়ে তারা বলেছে এতে জনগণ জেগে উঠবে, তাদের পক্ষে শাসন পরিচালনা কঠিন হবে। ফিলিপাইনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ঘটে তার পরবর্তী যুগে। অথচ এখন সেই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট হলেন সাবেক স্বৈরশাসকের সন্তান, সাবেক অপরাধী। অন্যদিকে, যাদের হাত দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটল তারাই পরাজিত হলেন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট